মো: মহিব্বুল্লাহঃ
রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বসিলা এলাকায় অনুমোদনহীন বহুতল ভবন নির্মাণ নিয়ে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ, রাজউকের নোটিশ এবং আইনগত পদক্ষেপের ঘোষণা-কোনকিছুকেই যেন পরোয়া করছেন না ভবন মালিক মোমিন। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সতর্কতা, জনসমালোচনা এবং প্রশাসনিক কার্যক্রমের তথ্য প্রকাশ্যে আসার পরও তার নির্মাণকাজ অব্যাহত থাকায় এলাকাজুড়ে ক্ষোভ, উদ্বেগ এবং নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।
মোহাম্মদপুরের বসিলা ৪০ ফিট রোডে এলপি গ্যাস ডিপোর পাশের বাড়ি নং-১২ এ নির্মাণাধীন ভবনটির বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মাত্র ৩ কাঠা জমির ওপর ভবনটি নির্মাণ করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে ৯ তলার ছাদের কাজ সম্পন্ন হয়েছে এবং বর্তমানে ১০ তলার ছাদের নির্মাণকাজ চলমান রয়েছে।
গণমাধ্যমে এ সংক্রান্ত সংবাদ প্রকাশের পর সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ছিল, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে এবং নির্মাণকাজ বন্ধ হবে। কিন্তু বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। সংবাদ প্রকাশের পরও নির্মাণকাজ বন্ধ না হয়ে বরং আরও দ্রুতগতিতে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, ভবনটিতে আইনানুগ পার্কিং সুবিধা রাখা হয়নি। ভবনের নিচতলা বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহার করা হলেও যানবাহন রাখার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। ফলে ভবিষ্যতে এই এলাকায় যানজট, জনদুর্ভোগ এবং নিরাপত্তা ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
[caption id="attachment_4239" align="aligncenter" width="1204"]
ভবনের বর্তমান অবস্থা এবং লাল দাগে ভবনের নিচের দোকান[/caption]
স্থানীয় সূত্রে আরও জানা গেছে, ভবনটির নিচতলায় ইতোমধ্যে দুটি দোকান নির্মাণ করে ভাড়া দেওয়া হয়েছে এবং সেখানে নিয়মিত ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। অথচ ভবনটির উপরের অংশে এখনো নির্মাণকাজ চলমান রয়েছে। ফলে একদিকে নির্মাণশ্রমিকদের কাজ চলছে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষ, দোকান কর্মচারী এবং ক্রেতাদের নিয়মিত যাতায়াত অব্যাহত রয়েছে।
এ অবস্থায় স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। তাদের প্রশ্ন, যে ভবনের নির্মাণকাজ এখনো শেষ হয়নি, সেই ভবনের নিচতলায় দোকান ভাড়া দিয়ে ব্যবসা পরিচালনার সুযোগ দেওয়া কতটা নিরাপদ? কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা ঘটলে দোকান মালিক, কর্মচারী এবং প্রতিদিন সেখানে আসা সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার দায়ভার কে নেবে?
সংশ্লিষ্টদের মতে, অনুমোদনবিহীন ও বিধিমালা উপেক্ষা করে নির্মিত ভবন শুধু আইন লঙ্ঘনের বিষয় নয়; এটি জননিরাপত্তার জন্যও বড় ধরনের হুমকি হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে ভবনের নকশা, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনীয় বিধিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ না করা হলে ভবিষ্যতে অগ্নিকাণ্ড, ভূমিকম্প কিংবা অন্য কোনো বড় দুর্ঘটনার সময় বাসিন্দারা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়তে পারেন।
প্রশ্ন উঠেছে, মানুষের নিরাপদ আবাসন নিশ্চিত করার পরিবর্তে যদি কোনো ভবন নির্মাণই ভবিষ্যতে জীবনঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে তার দায়ভার কে নেবে? নিরাপদ বসবাসের স্বপ্ন দেখিয়ে নির্মিত কোনো ভবন যেন সম্ভাব্য ঝুঁকির উৎসে পরিণত না হয়, সে দায়িত্ব কি শুধুই ক্রেতাদের, নাকি নির্মাণ সংশ্লিষ্টদেরও জবাবদিহিতার আওতায় আসতে হবে?
এদিকে রাজউকের পক্ষ থেকে ভবনটির বিরুদ্ধে নোটিশ প্রদান, বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্নের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে চিঠি প্রদান এবং মোবাইল কোর্ট পরিচালনার উদ্যোগের কথা জানানো হলেও মাঠপর্যায়ে তার কার্যকর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। ফলে সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে—সরকারি নির্দেশনা উপেক্ষা করে নির্মাণকাজ চালিয়ে যাওয়ার সাহস ভবন মালিক কোথা থেকে পাচ্ছেন?
এ বিষয়ে রাজউক জোন ৫/১ এর ইমারত পরিদর্শক উজ্জ্বল দেবনাথ বলেন, মোহাম্মদপুর একটি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হওয়ায় এখানে অনেক সময় কার্যক্রম পরিচালনা করতে বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়। তারপরও আমরা আমাদের সাধ্যমতো কাজ করে যাচ্ছি। ভবনটির বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে এবং যত দ্রুত সম্ভব আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন, যদি রাজউক ইতোমধ্যে ভবনটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নিয়ে থাকে, তাহলে সেই প্রক্রিয়ার দৃশ্যমান ফলাফল কোথায়? কেন এখনো নির্মাণকাজ বন্ধ হয়নি? আর কতদূর এগোলে কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যাবে?
অনুসন্ধানে জানা যায়, বিভিন্ন সময় প্রভাবশালী ব্যক্তি, গণমাধ্যম সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে নিজের অবস্থান শক্তিশালী হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পরও তিনি নির্মাণকাজ বন্ধ না করে স্বাভাবিকভাবেই কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন, যা স্থানীয়দের মধ্যে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
প্রশ্ন উঠেছে, শুধুমাত্র একজন ব্যক্তির পক্ষে কি রাজউকের নোটিশ, প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এবং জনসমালোচনাকে উপেক্ষা করে প্রকাশ্যে নির্মাণকাজ চালিয়ে যাওয়া সম্ভব? নাকি এর পেছনে রয়েছে কোনো অদৃশ্য প্রভাবশালী মহলের আশ্রয়-প্রশ্রয়?
এলাকাবাসীর দাবি, বিষয়টি শুধুমাত্র একটি ভবনের অনিয়ম নয়; এটি আইনের শাসন, প্রশাসনিক জবাবদিহিতা এবং নগর উন্নয়ন ব্যবস্থার কার্যকারিতার একটি বড় পরীক্ষা। তারা মনে করেন, ভবনটির অনুমোদন, নকশা, নির্মাণ প্রক্রিয়া এবং এর সঙ্গে জড়িত সকল ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা খতিয়ে দেখে প্রকৃত তথ্য জনসম্মুখে তুলে ধরা প্রয়োজন।
এখন প্রশ্ন একটাই—গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ, রাজউকের নোটিশ এবং প্রশাসনিক পদক্ষেপের ঘোষণা সত্ত্বেও যদি নির্মাণকাজ বন্ধ না হয়, তাহলে এই বেপরোয়া কর্মকাণ্ডের পেছনে আসল শক্তি কোথায়? আর সেই শক্তির কারণেই কি ভবন মালিক মোমিন আইন, বিধিমালা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রকাশ্যে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে যাচ্ছেন?
সম্পাদক : এম কামাল কবীর 📧 m.kamalkabir62@gmail.com ✆ +৮৮০১৭১৪৯২৫৬০৬ ।
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ হোল্ডিং নং ২ (৩য় তলা), রোড নং : ১, ব্লখ : খ,পি সি কালচার আদাবর,ঢাকা -১২০৭।
📧bartomankhobor@gmail.com ✆ +৮৮০১৮৮০১১৫৮৪৪
কপিরাইট @২০২৬, দৈনিক বর্তমান খবর সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের যেকোনো লেখা, ছবি বা ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি ও দন্ডনীয় অপরাধ।