সুন্দরবন বাঁচলে বাঁচবে উপকূল, উপকূল রক্ষায় টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ আবশ্যক : এমপি মাওলানা আবুল কালাম আজাদ

প্রকাশিত: ৮:৪৪ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১৪, ২০২৬

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে প্রকৃতিতে এসেছে নতুন আমেজ। আজ পহেলা ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ। প্রকৃতিতে কোকিলের সুর লহরি, বসন্তের মিষ্টি বাতাস প্রকৃতিকে করেছে প্রাণোচ্ছল নান্দনিক। আবার ইংরেজি ক্যালেন্ডারে আজ ১৪ ফেব্রুয়ারি, সুন্দরবন দিবস। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) ও উপকূলভিত্তিক সংগঠনগুলোর উদ্যোগে ২০০১ সালে ১৪ ফেব্রুয়ারিকে ‘সুন্দরবন দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এরপর থেকে দিবসটি বেসরকারিভাবে পালিত হচ্ছে এবং এটিকে সরকারি স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।

পহেলা ফাল্গুনের বসন্তের শুভেচ্ছা আর সুন্দরবন দিবসের প্রত্যয়ে আজ নতুন করে উচ্চারিত হচ্ছে দেশের প্রাকৃতিক রক্ষাকবচ সংরক্ষণের আহ্বান। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামলে পরিবেশ সচেতন মহলের উদ্যোগে প্রতি বছরের মতো এবারও সারাদেশে ১৪ ফেব্রুয়ারি পালিত হচ্ছে ‘সুন্দরবন দিবস’। উপকূলীয় জনপদের জীবন-জীবিকা ও নিরাপত্তার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত এই বনভূমি রক্ষায় জনসচেতনতা বাড়ানোই সুন্দরবন দিবসের মূল লক্ষ্য।

বাংলাদেশে সুন্দরবন মূলত ৫টি জেলা নিয়ে গঠিত। জেলাগুলো হলো: খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, পটুয়াখালী ও বরগুনা। মোট আয়তন প্রায় ৬,০১৭ বর্গকিলোমিটার। প্রশাসনিকভাবে বনটি পটুয়াখালী ও বরগুনা সহ সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলা, খুলনার কয়রা ও দাকোপ উপজেলা এবং বাগেরহাটের মোংলা ও শরণখোলা উপজেলার সংলগ্ন বিস্তীর্ণ বনাঞ্চল নিয়ে গঠিত। জোয়ার-ভাটা নির্ভর নদী-খাল ও লবণাক্ত-মিঠা পানির মিলনে গড়ে ওঠা এই বন পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ ইকোসিস্টেম।

সুন্দরবনের বৈশ্বিক গুরুত্ব বিবেচনায় জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা ইউনেস্কো ১৯৯৭ সালের ৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ অংশের সুন্দরবনকে বিশ্ব ঐতিহ্য (World Heritage Site) হিসেবে ঘোষণা করে। এই স্বীকৃতি বনটির আন্তর্জাতিক গুরুত্বকে আরও সুদৃঢ় করে।

প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ উপকূলীয় বাংলাদেশের জন্য সুন্দরবন এক অনন্য প্রাকৃতিক সুরক্ষা প্রাচীর হিসেবে কাজ করে। ঘূর্ণিঝড়ের সময় বনটির ঘন বৃক্ষবিন্যাস প্রবল বাতাসের গতি অনেকটা কমিয়ে দেয় এবং জলোচ্ছ্বাসের ঢেউ ভেঙে উপকূলীয় জনপদকে আঘাত থেকে কিছুটা হলেও রক্ষা করে। একই সঙ্গে এটি নদীভাঙন ও লবণাক্ততার বিস্তার কমাতে সহায়তা করে, যা কৃষি ও বসতি রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সুন্দরবন বিপুল পরিমাণ কার্বন গ্যাস শোষণ করে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব প্রশমনে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে এবং অসংখ্য মাছ ও বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আবাসস্থল হিসেবে দেশের জীববৈচিত্র্য টিকিয়ে রাখছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সুন্দরবন না থাকলে উপকূলীয় দুর্যোগে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা বহুগুণ বেড়ে যেতো।

বাংলাদেশের সুন্দরবন জীববৈচিত্র্যের এক অপূর্ব ভাণ্ডার, যেখানে বন, নদী ও বন্যপ্রাণ একে অপরের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত। এই ম্যানগ্রোভ অরণ্যের সবচেয়ে আকর্ষণীয় প্রাণী হলো রয়েল বেঙ্গল টাইগার, যা সুন্দরবনের প্রতীক হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিত এবং ২০২৪ সালের সর্বশেষ ক্যামেরা ট্র্যাপ জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশের সুন্দরবনে বর্তমানে বাঘের সংখ্যা ১২৫টি। এছাড়া এখানে চিত্রা হরিণ, মায়া হরিণ, লবণাক্ত পানির কুমির, বানর, বনবিড়ালসহ অসংখ্য বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আবাস রয়েছে। সুন্দরী, গেওয়া, গরান, গোলপাতাসহ লবণসহিষ্ণু নানা প্রজাতির গাছগাছালি এই বনকে ঘন ও জীবন্ত করে রেখেছে। একই সঙ্গে সুন্দরবনের নদী-খালগুলো ইলিশ, পারশে, ভেটকি, চিংড়ি ও কাঁকড়াসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছের সমৃদ্ধ আবাসস্থল সুন্দরবন।

সুন্দরবন ঘিরে গড়ে উঠেছে উপকূলীয় হাজারো মানুষের জীবন-জীবিকা। স্থানীয়রা বাওয়ালি (বনজ সম্পদ সংগ্রহকারী), মৌয়াল (মধু সংগ্রহকারী), জেলে এবং গোলপাতা সংগ্রাহক হিসেবে কাজ করেন। বন থেকে সংগৃহীত মধু, মাছ, কাঁকড়া, চিংড়ি ও গোলপাতা স্থানীয় অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কয়রা–পাইকগাছার মানুষের সুন্দরবন নির্ভরতা প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ খুলনার কয়রা উপজেলা ও পাইকগাছা উপজেলা এলাকার মানুষের জীবন সুন্দরবনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত। ঘূর্ণিঝড় আইলা, আম্ফান সহ বড় দুর্যোগের সময় সুন্দরবন এই জনপদকে ঢাল হিসেবে রক্ষা করেছে।এই দুই উপজেলার বহু পরিবার জীবিকার জন্য নিয়মিত সুন্দরবনে যান—কেউ বাওয়ালি হয়ে কাঠ ও গোলপাতা সংগ্রহ করেন, কেউ মৌয়াল হয়ে মধু আহরণ করেন, আবার অনেকে নদী ও খালে মাছ, কাঁকড়া ও চিংড়ি ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন। দুর্যোগের পর যখন কৃষিজমি লবণাক্ত হয়ে পড়ে, তখন বননির্ভর পেশাই হয়ে ওঠে তাদের প্রধান ভরসা।

কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি সেই ব্রিটিশ শাসনামল থেকে আজ পর্যন্ত এই দক্ষিণাঞ্চলের প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রবণ কয়রা-পাইকগাছায় স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণের যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। তাই অবহেলিত ভঙ্গুর বেড়িবাঁধ সংবলিত এ অঞ্চলের মানুষের দুঃখ আজন্ম থেকেই গেলো।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততা, অবৈধ আহরণ ও দূষণ সুন্দরবনের জন্য বড়ো হুমকি। তাই টেকসই ব্যবস্থাপনা, বিকল্প জীবিকা, গবেষণা জোরদার এবং স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করাই এখন সময়ের দাবি। পহেলা ফাল্গুনের নবীনতায় ভর করে সুন্দরবন দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়—প্রকৃতির এই সবুজ প্রাচীর রক্ষা করা মানে দেশের ভবিষ্যৎকে সুরক্ষিত রাখা। উপকূল অঞ্চলে স্থায়ী টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ মানেই তাদেরকে সুষ্ঠু সুন্দর জীবনে ফিরিয়ে আনা। সুন্দরবন বাঁচলে বাঁচবে উপকূল, আর টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ হলে লবণ পানির ছোবল থেকে বাঁচবে উপকূল।

লেখক: এমপি মাওলানা আবুল কালাম আজাদ