মাহ্তাবুর রহমানঃ
জুলাই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ‘৩৫ জুলাই’ হিসেবে পরিচিত ৪ আগস্ট ছিল বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম রক্তক্ষয়ী দিন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ঘোষিত *সর্বাত্মক অসহযোগ কর্মসূচির প্রথম দিনেই রাজধানী ঢাকাসহ দেশের অধিকাংশ জেলা ও মহানগরে বিক্ষোভ, অবরোধ, সংঘর্ষ ও সহিংসতার ঘটনা ঘটে। দিনভর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, আন্দোলনকারী এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষে বহু মানুষের প্রাণহানি ও শত শত মানুষ আহত হন। বিভিন্ন গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, এটি জুলাই–আগস্ট আন্দোলনের সবচেয়ে প্রাণঘাতী দিনগুলোর একটি ছিল।
সকাল থেকেই রাজধানীর শাহবাগ, বাংলামোটর, ফার্মগেট, মিরপুর, উত্তরা, যাত্রাবাড়ী, বাড্ডা, রামপুরা, সায়েন্স ল্যাব, মোহাম্মদপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় হাজারো শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ অবস্থান নেন। ‘এক দফা’ দাবির সমর্থনে তারা সড়ক অবরোধ, বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেন। বিভিন্ন স্থানে যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায় এবং নগরজীবন কার্যত অচল হয়ে পড়ে।
দুপুরের পর রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশ ও ক্ষমতাসীন দলের সমর্থকদের সংঘর্ষ শুরু হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী টিয়ার গ্যাস, সাউন্ড গ্রেনেড, রাবার বুলেট এবং ছত্রভঙ্গ করার অন্যান্য উপায় ব্যবহার করে। পাল্টা ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষে বহু মানুষ আহত হন এবং বিভিন্ন হাসপাতাল আহতদের ভিড়ে পূর্ণ হয়ে যায়।
শুধু রাজধানীতেই নয়, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, সিলেট, বরিশাল, রংপুর, কুমিল্লা, নরসিংদী, ফেনী, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, যশোর, কুষ্টিয়া, ময়মনসিংহসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় ব্যাপক সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। কোথাও কোথাও সরকারি স্থাপনা, রাজনৈতিক কার্যালয় ও যানবাহনে অগ্নিসংযোগ এবং ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটে। বিভিন্ন জেলার পুলিশ স্টেশনেও হামলার খবর প্রকাশিত হয়।
সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর থানায় হামলায় একাধিক পুলিশ সদস্য নিহত হওয়ার ঘটনা দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়। একই সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনকারীদের প্রাণহানির খবরও আসতে থাকে। দিন শেষে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও দেশীয় সংবাদমাধ্যম জানায়, সারা দেশে নিহতের সংখ্যা ৯০-এর বেশি ছাড়িয়ে যায়, যদিও বিভিন্ন সূত্রে সংখ্যার তারতম্য ছিল।
রাজধানীর ফার্মগেট এলাকায় গুলিবিদ্ধ স্কুলশিক্ষার্থী গোলাম নাফিজ-এর রিকশায় হাসপাতালে নেওয়ার ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে এবং আন্দোলনের অন্যতম প্রতীকী দৃশ্যে পরিণত হয়। ঘটনাটি দেশ-বিদেশে গভীর প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে।
দিনের পরিস্থিতি অবনতির পর সরকার সন্ধ্যা ৬টা থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য কারফিউ জারি করে। একই সঙ্গে সোমবার থেকে তিন দিনের সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়। মোবাইল ইন্টারনেট এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রবেশও সীমিত বা বন্ধ করে দেওয়া হয়, ফলে দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।
এদিকে আন্দোলনের সমন্বয়করা পরিস্থিতি সত্ত্বেও কর্মসূচি অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেন। বিকেলে তারা পূর্বঘোষিত কর্মসূচি পরিবর্তন করে ৫ আগস্ট ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি এক দিন এগিয়ে আনার ঘোষণা দেন। আন্দোলনের নেতারা বলেন, দেশের চলমান পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে কর্মসূচি ত্বরান্বিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, আইনজীবী, চিকিৎসক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা সহিংসতা বন্ধের আহ্বান জানান। একই সঙ্গে মানবাধিকার সংগঠনগুলো প্রাণহানির নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানায়। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমও সারা দিনের ঘটনাকে বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক সংকটের সবচেয়ে গুরুতর পর্যায় হিসেবে তুলে ধরে।
সম্পাদক : এম কামাল কবীর 📧 m.kamalkabir62@gmail.com ✆ +৮৮০১৭১৪৯২৫৬০৬ ।
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ হোল্ডিং নং ২ (৩য় তলা), রোড নং : ১, ব্লখ : খ,পি সি কালচার আদাবর,ঢাকা -১২০৭।
📧bartomankhobor@gmail.com ✆ +৮৮০১৮৮০১১৫৮৪৪
কপিরাইট @২০২৬, দৈনিক বর্তমান খবর সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের যেকোনো লেখা, ছবি বা ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি ও দন্ডনীয় অপরাধ।