রংপুর ব্যুরো: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রংপুর বিভাগে নারীদের অংশগ্রহণ ধীরে ধীরে বাড়লেও এখনো তা কাঙ্খিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। এবারের নির্বাচনে নারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পেয়েছে। দেশের সবশেষ ৪টি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, একাদশ নির্বাচন পর্যন্ত নারীরা সংখ্যাগতভাবে অংশগ্রহণে পিছিয়ে। তবে এর পর থেকে নির্বাচনে অংশগ্রহণের ধারা ঊর্ধ্বমুখী।
নির্বাচন কমিশন থেকে পাওয়া তথ্য অনুয়ায়ী জানা যায়,দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রংপুর বিভাগের ৩৩টি সংসদীয় আসনে নারীর অংশগ্রহণ ছিল খুবই কম। ওই নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট ভোট বর্জনের কারণে অধিকাংশ আসনে বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়। সেই নির্বাচনে গাইবান্ধা-২(সদর) আসন থেকে মাহাবুব আরা গিনি আর রংপুর-৬ (পীরগঞ্জ) আসনে ড.শিরিন শারমিন চৌধুরী বিজয়ী হন।
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রংপুর রিভাগের আট জেলার ৩৩টি আসনের মধ্যে নারী প্রার্থী ছিলেন ৩ জন। রংপুর-৩ (সদর) আসনে রিটা রহমান, রংপুর-৬ (পীরগঞ্জ) আসনে ড. শিরিন শারমিন চৌধুরী এবং গাইবান্ধা-২ (সদর) আসনে মাহাবুব আরা গিনি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন।
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারীদের অংশগ্রহণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা যায়। বিভাগের ৩৩টি আসনে অংশ নিতে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন ২৩ জন নারী। যাচাই-বাছাই, প্রত্যাহারসহ বিভিন্ন প্রক্রিয়া শেষে নির্বাচনে ছিলেন ১৫ জন নারী। তাদের মধ্যে নির্বাচনে জয়ী হয়েছিলেন রংপুর-৬ (পীরগঞ্জ) আসনে ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী,গাইবান্ধা-৩ (পলাশবাড়ী-সাদুল্লাপুর) আসনে উম্মে কুলসুম স্মৃতি এবং গাইবান্ধা-১ (সুন্দরগঞ্জ) আসনে আব্দুল্লাহ নাহিদ নিগার।
ওই নির্বাচনে অংশগ্রহণ রংপুর-১(গঙ্গাচড়া) আসনে বাংলাদেশ কংগ্রেসের শ্যামলী রায়, রংপুর-৬ (পীরগঞ্জ) আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী তাকিয়া জাহান চৌধুরী, গাইবান্ধা-১ (সুন্দরগঞ্জ) আসনে বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির আইরিন আক্তার, এনএনপির মর্জিনা খান, গাইবান্ধা-২ (সদর) আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী মাছুমা আক্তার, দিনাজপুর-৩ আসনে ন্যাশনাল পিপলস্ পার্টি (এনপিপি)’র পারুল সরকার লিনা, দিনাজপুর-৪ আসনে এনপিপির আজিজা সুলতানা, ঠাকুরগাঁও-২ আসনে জাতীয় পার্টির নুরুন নাহার বেগম, বাংলাদেশ কংগ্রেসের রিম্পা আকতার এবং ঠাকুরগাঁও-৩ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী আশা মনি।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার জন্য রংপুর বিভাগের ৩৩টি আসনের মধ্যে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেন ১০ জন নারী প্রার্থী। তাঁরা হলেন ঠাকুরগাঁও-২ আসনে জাতীয় পার্টির নুরুন নাহার বেগম, ঠাকুওগাঁও-৩ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী আশা মনি, দিনাজপুর-৩ আসনে মুসলিম লীগের লায়না তুল রীমা, রংপুর-৩ আসনে তৃতীয় লিঙ্গের স্বতন্ত্র প্রার্থী আনোয়ারা ইসলাম রানী, স্বতন্ত্র প্রার্থী রিটা রহমান, রংপুর-৪ আসনে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)-এর প্রগতি বর্মণ তমা, রংপুর-৬ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী তাকিয়া জাহান চৌধুরী, কুড়িগ্রাম-৪ আসনে বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টির শেফালি বেগম, গাইবান্ধা-১ আসেন স্বতন্ত্র প্রার্থী ছালমা আক্তার ও গাইবান্ধা-৫ আসনে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ-মার্কসবাদী) এর রাহেলা খাতুন।
দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩৩টি আসনেই উল্লেখযোগ্য নারী প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নেওয়ায় রাজনৈতিক অঙ্গনে নারীদের আগ্রহ বাড়ার ইঙ্গিত। তবে অনুসন্ধানে দেখা যায়,রংপুরে যেসব নারী প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নেন,তাঁদের একটি বড় অংশ স্বতন্ত্র বা ছোট রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি।
বড় রাজনৈতিক দলগুলোতে নারীদের মনোনয়ন দেওয়া হয় মূলত প্রতীকী আসনে বা এমন এলাকায়,যেখানে দলের জয়ের সম্ভাবনা তুলনামূলক কম। ফলে নারী প্রার্থীর সংখ্যা বাড়লেও নির্বাচিত হওয়ার হার এক শতাংশেরও কম। একাধিক নারী প্রার্থীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দলীয় মনোনয়ন পেতে গিয়ে তাঁদের সবচেয়ে বড় বাধা অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও সাংগঠনিক প্রভাব।
একইসঙ্গে মাঠে কাজ,জনপ্রিয়তা সব থাকলেও শেষ পর্যন্ত মনোনয়ন বোর্ডে সিদ্ধান্ত হয় অন্যভাবে। সেখানে নারীর কণ্ঠ খুব কমই শোনা যায়।
রংপুর-৩ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী আনোয়ারা ইসলাম রানী প্রার্থী বলেন, নারীরা আর শুধু নামকাওয়াস্তে রাজনীতিতে আসছেন না। আমরা মাঠে কাজ করছি, ভোট চাইছি। নারীদের জন্য সমান সুযোগ নেই এটাই বড় বাধা। এরপরও আমরা কাজ করছি সাধারণ মানুষের অধিকারের জন্য।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রংপুর বিভাগে নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ঊর্ধ্বমুখী হলেও তা এখনও শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়ায়নি। রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া অংশগ্রহণ দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর প্রতিনিধিত্বে রূপ নেবে কিনা, সেই প্রশ্ন থেকে যায়।
জাতীয় বা স্থানীয় নির্বাচনে নারীর অংশগ্রহণ সংখ্যায় বাড়লেও এখনও তা প্রতীকী। রাজনৈতিক দলের সিদ্ধান্তগ্রহণ পর্যায়ে নারীদের জায়গা না বাড়লে অংশগ্রহণ তাঁদের বাস্তব ক্ষমতায় রূপ নেবে না। এ ক্ষেত্রে সমস্যাটি কেবল সামাজিক নয়, এটি মূলত কাঠামোগত। রাজনৈতিক দলগুলোর কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় কমিটিতে নারীর অংশগ্রহণ কম থাকায় মনোনয়ন প্রক্রিয়ায়ই তারা পিছিয়ে পড়ে। ফলে অংশগ্রহণ বাড়লেও তা ক্ষমতার কেন্দ্রে পৌঁছাতে পারছে না।
জাতীয় সংসদে নারীর প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে হলে দলীয়ভাবে তাঁদের ন্যূনতম কোটা, প্রশিক্ষণ ও অর্থনৈতিক সহায়তা জরুরি।



