শের শাহ সুরি সম্পর্কে আপনার যত অজানা

প্রকাশিত: ১১:২৭ পূর্বাহ্ণ, জানুয়ারি ১৫, ২০২৫
শের শাহ সুরি

শের শাহ সুরি: একজন মহান শাসক এবং তার অবদান

শের শাহ সুরি, আসল নাম ছিল ফারিদ খান, একজন শক্তিশালী এবং প্রভাবশালী শাসক, যিনি ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তার শাসনামল বাংলা, বিহার, উত্তর ভারত ও সমগ্র উপমহাদেশে এক নতুন যুগের সূচনা করেছিল। সেরা শাসকদের মধ্যে তার স্থান, তার প্রশাসনিক দক্ষতা, সাহসিকতা, কৌশলী চিন্তা এবং ন্যায়পরায়ণতার কারণে।

শের শাহ সুরির জন্ম পরিচিতি
শের শাহ সুরির জন্ম ১৪৯৯ সালে বর্তমান পাকিস্তানের পাকিস্তানী পাঞ্জাব অঞ্চলের সাসি নামক স্থানে। তার পিতার নাম মুর্শিদ খাঁ, যিনি একাধারে এক সাধারণ সেনাপতি ছিলেন। শের শাহ সুরির শৈশবকাল ছিল চ্যালেঞ্জিং, কারণ তার পিতার সামরিক পদমর্যাদা সত্ত্বেও তাদের পরিবারের অর্থনৈতিক অবস্থা খুব ভালো ছিল না। তবে, তার শৈশবকাল থেকেই তার মধ্যে এমন কিছু গুণ ছিল যা তাকে এক মহান শাসক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল।

শের শাহ সুরির কর্মজীবন শুরু
শের শাহ সুরির কর্মজীবন শুরু হয় এক তরুণ সেনাপতি হিসেবে। শের শাহ শুরুর শাসনামলে ভারতীয় উপমহাদেশে বিভিন্ন সাম্রাজ্যিক কৌশল ও রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটেছিল। প্রথমদিকে তিনি একটি সাধারণ সৈন্য হিসেবে কাজ শুরু করেন এবং পরবর্তীতে বিভিন্ন সেনাপতির সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলেন।

তার কর্মজীবনের শুরুতে শের শাহ সুরি স্থানীয় একটি সৈন্য বাহিনীতে যোগ দেন, তবে তার কর্মদক্ষতা এবং সাহসিকতা তাকে দ্রুত উচ্চ পদে উন্নীত করে। তার পরবর্তী জীবনে, শের শাহ সুরি পলাশী যুদ্ধের পর সুরি সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।

শের শাহ সুরির সাফল্য
শের শাহ সুরির শাসনকাল ছিল মাত্র পাঁচ বছর, তবে এই পাঁচ বছরে তিনি যা অর্জন করেছিলেন তা চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তার শাসনের সময়, তিনি একাধিক অত্যাধুনিক প্রশাসনিক সংস্কার এবং সামাজিক উন্নয়নের জন্য পরিচিতি লাভ করেন।

১. প্রশাসনিক সংস্কার
শের শাহ সুরি নিজেকে এক আদর্শ শাসক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। তিনি তাঁর রাজ্যকে এক শক্তিশালী প্রশাসনিক কাঠামো দিয়ে শাসন করেছিলেন। তার প্রশাসনিক সংস্কারগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল:

নতুন মুদ্রাব্যবস্থা: শের শাহ সুরি স্বর্ণ এবং রৌপ্য মুদ্রা চালু করেন, যা খুবই সঠিক ও নির্ভুল ছিল। তার মুদ্রাব্যবস্থা ভারতের পরবর্তী শাসকদের জন্য একটি মাপকাঠি হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

অভিযান ব্যবস্থা: তিনি তাঁর রাজ্যকে প্রশাসনিকভাবে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করতে নতুন নতুন অফিস এবং সরকারী পদ সৃষ্টি করেন, যাতে প্রতিটি অঞ্চলের উপর নিয়ন্ত্রণ রাখা যায়। প্রতি অঞ্চলে একটি “কর্তা” (প্রশাসক) নিযুক্ত করা হয়েছিল, যাদের কাজ ছিল রাজস্ব সংগ্রহ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা।

শাসনের দৃষ্টিভঙ্গি: শের শাহ সুরি তার শাসনামলে প্রশাসনিক ক্ষেত্রে দুর্নীতি নির্মূল করতে সক্ষম হন এবং জনগণের কল্যাণে কাজ করতে শুরু করেন। তিনি মন্ত্রীরা এবং কর্মকর্তাদের জন্য কঠোর নিয়মাবলী তৈরি করেছিলেন।

২. যোগাযোগ ব্যবস্থা
শের শাহ সুরি তাঁর শাসনামলে সড়ক ও যোগাযোগ ব্যবস্থার ব্যাপক উন্নয়ন করেছিলেন। তিনি তাঁর সাম্রাজ্যের মধ্যে একটি বিস্তৃত রাস্তাঘাটের নেটওয়ার্ক তৈরি করেছিলেন যা আজও তার সফলতার অন্যতম চিহ্ন।

বড় রাস্তা নির্মাণ: তিনি দিল্লি থেকে কাবুল পর্যন্ত একটি সড়ক নির্মাণ করেছিলেন, যার দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ২ হাজার কিলোমিটার। এই রাস্তা পরবর্তীতে “শাহ সুরি রোড” নামে পরিচিতি লাভ করে।

রাস্তার পাশের সার্ভিস স্টেশন: তিনি রাস্তার পাশে ‘সরাই’ (বসতি) নির্মাণ করেছিলেন, যেখানে যাত্রীরা বিশ্রাম নিতে পারতেন এবং পণ্য পরিবহণের জন্য স্টেশনগুলো ছিল। এই ব্যবস্থা ছিল ভ্রমণকারীদের জন্য সুবিধাজনক এবং নিরাপদ।

৩. সামরিক কৌশল
শের শাহ সুরি তাঁর শাসনামলে অনেক যুদ্ধের মাধ্যমে তার ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। তিনি একজন কৌশলী সেনাপতি ছিলেন এবং তার যুদ্ধের কৌশল ছিল অত্যন্ত উন্নত। তার সবচেয়ে বড় সামরিক কৌশল ছিল একটি উচ্চ দক্ষতার সেনাবাহিনী তৈরি করা।

সেনাবাহিনীর পুনর্গঠন: তিনি তার সেনাবাহিনীকে আরো সংগঠিত এবং শক্তিশালী করেছিলেন। তাঁর সেনাবাহিনীতে সেপাই, সিপাহী, আর্মি হেডকোয়ার্টার এবং অন্যান্য যুদ্ধব্যবস্থা ছিল অনেক ভালো।

দিল্লির প্রতিরোধ: শের শাহ সুরির অন্যতম বড় বিজয় ছিল দিল্লি বিজয়। তিনি সামরিক কৌশলের মাধ্যমে দিল্লির সুলতান ইব্রাহিম লোদিকে পরাজিত করেছিলেন এবং শাসনক্ষমতা অর্জন করেছিলেন।

৪. সমাজকল্যাণ
শের শাহ সুরি শুধুমাত্র একটি সাম্রাজ্য নির্মাণে সক্ষম হননি, তিনি তার রাজ্যে সামাজিক কল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডেও ব্যাপক পরিবর্তন সাধন করেছিলেন।

স্বাস্থ্যসেবা: শের শাহ সুরি হাসপাতাল ও চিকিৎসা ব্যবস্থা গড়ে তোলেন, যেখানে সাধারণ জনগণ বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা পেতেন।

দারিদ্র্য বিমোচন: তিনি কৃষকদের জন্য বিভিন্ন ধরনের ঋণ ব্যবস্থা চালু করেন, যাতে তারা আর্থিকভাবে সংকটে না পড়ে এবং তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নত হয়।

শের শাহ সুরির মৃত্যু
১৫৪৫ সালে, শের শাহ সুরি তার নিজের সাম্রাজ্যকে আরো শক্তিশালী করতে বিভিন্ন অভিযান পরিচালনা করতে গিয়ে দুর্ঘটনাবশত মারা যান। তিনি এক সামরিক অভিযানে তার হস্তীর উপর বসে থাকা অবস্থায় দুর্ঘটনাবশত আহত হন এবং পরবর্তী সময়ে মারা যান। তার মৃত্যু তার শাসনকালের সমাপ্তি ঘটালেও তার রেখে যাওয়া কাজ এবং সংস্কার আজও পরবর্তী শাসকদের জন্য একটি আদর্শ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

শের শাহ সুরির ঐতিহাসিক অবদান
শের শাহ সুরি ইতিহাসে এক কিংবদন্তি শাসক হিসেবে চিহ্নিত হয়। তার শাসনামল কেবলমাত্র সামরিক জয় বা প্রশাসনিক দক্ষতার জন্য নয়, বরং তার সামাজিক এবং আর্থিক সংস্কারের জন্যও স্মরণীয় হয়ে থাকবে। শের শাহ সুরির শাসন বাংলার ইতিহাসে একটি নতুন দিগন্তের সূচনা করেছিল এবং পরবর্তীতে মুঘল সাম্রাজ্যও অনেকাংশে তার সাফল্য এবং পদ্ধতিগুলিকে অনুসরণ করেছিল।

তার শাসনাধীন সময়ে যে উন্নয়ন হয়েছিল, তা ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে এক নতুন যুগের সূচনা করেছিল